হেমিংওয়ের প্রধান উপন্যাসে ইউরোপীয় রমণী

হেমিংওয়ের প্রধান উপন্যাসে ইউরোপীয় রমণী : নোবেল বিজয়ী হেমিংওয়ে আধুনিক আমেরিকান উপন্যাস নির্মাণের এক দক্ষ কারিগর। তাঁর প্রধান কয়েকটি উপন্যাস: The Sun Also Rises, A Farewell to Arms এবং For Whom the Bell Tolls-এ লক্ষণীয় ভাবে আমেরিকান নায়কদের বিপরীতে উপস্থাপন করা হয়েছে ইউরোপীয় রমণীদের। এদের মধ্যে ব্রেট ও ক্যাথেরিন ব্রিটিশ আর মারিয়া হিস্পানিক। যুদ্ধ বিধ্বস্ত বিশৃঙ্খল পৃথিবীতে ভালবাসা ও সুখের অন্বেষণে তাঁরা সঙ্গী হয়েছেন আমেরিকান নায়কদের।

The Sun Also Rises
The Sun Also Rises

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইটালীতে রেডক্রসের এ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার হিসেবে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েই ইউরোপের সঙ্গে হেমিংওয়ের প্রথম যোগাযোগ। কালক্রমে সেই যোগাযোগ আরো গভীর হয়েছে সাংবাদিক হিসেবে হেমিংওয়ের ইউরোপের বিভিন্ন দেশে দায়িত্ব পালনকালে। তাঁর প্রায় সকল প্রধান উপন্যাসে ইউরোপীয় রমণীদের উপস্থাপন নিঃসন্দেহে ইউরোপের প্রতি হেমিংওয়ের আবেগের বহিঃপ্রকাশ।

[ হেমিংওয়ের প্রধান উপন্যাসে ইউরোপীয় রমণী ]

সমালোচক Scott Donaldson তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ By Force of Will : the Life and Art of Ernest Hemingway-তে লিখেছেন “আর্নেস্ট হেমিংওয়ে তাঁর উপন্যাসে ব্যবহার করেছেন ইউরোপীয় ঘরানার এমন সব নম্র স্বভাবের রমণীদের, যারা তাদের প্রেমিকদের মনের খোরাক জুগিয়েই তুষ্ট নয়, অনায়াসে দৈহিকভাবে বিলিয়ে দেয় স্বীয় সত্তাকে। আর সে কারণেই তাঁর উপন্যাসের নায়িকারা ভিনদেশী।”

উল্লেখিত নায়িকারা যেভাবে নায়কদের মাঝে নিজেদের বিলিয়ে দিয়েছে অধিক সচেতন ও স্বাধীনচেতা আমেরিকান রমণীরা সে ভূমিকা পালনে শুধু অনীহাই প্রকাশ করতনা, বরং তাকে অবমাননাকর ও অনৈতিক মনে করত। এ প্রসঙ্গে হেমিংওয়ের নায়িকাদের ব্যাপারে বিভিন্ন সমালোচকের নেতিবাচক মন্তব্যের কথা এসে যায়।

একমাত্র Lionel Trilling ইতিবাচকভাবে হেমিংওয়ের নায়িকাদের “অত্যাবশ্যকীয়ভাবে নিষ্পাপ ও আবেগ তাড়িত” অভিহিত করলেও Jackson Benson তাঁদের কঠোরভাবে নিন্দা করেছেন “পরিপূর্ণ দুঃশ্চরিত্রা নারী” ও “আক্রমণাত্মক অনারীসুলভ রমণী” অভিধায়। নিন্দাবাদে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন Pamela Farley, কারণ তাঁর বিবেচনায় হেমিংওয়ের নায়িকারা “নারীত্বের অধঃপতনের প্রতীক।” আলোচ্য প্রবন্ধে আমার অবস্থান এই মনোভাবের বিরুদ্ধে। প্রধান তিনটি উপন্যাসের কেন্দ্রীয় নারী চরিত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে আমি এই ধারণাই প্রতিষ্ঠিত করতে চাই যে মনস্তাত্ত্বিকভাবে হেমিংওয়ের নায়িকাদের আচরণ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।

The Sun Also Rises
The Sun Also Rises

The Sun Also Rises উপন্যাসে ব্রেট এ্যাশলে জাতিতে ব্রিটিশ। যুদ্ধ পরবর্তী প্রজন্মের বন্ধনমুক্ত নারী সত্তায় তিনি বিশ্বাসী। তাঁর দৈহিক সৌন্দর্য ও আকর্ষণে মুগ্ধ প্রায় প্রতিটি পুরুষ। ঐ আকর্ষণেই তারা ব্রেটের চারপাশে ঘুরে বেড়ায়। রবার্ট কোন তাঁকে “লক্ষণীয়ভাবে আকর্ষণীয়” মনে করে এবং ছায়ার মত তার পেছনে ঘোরে। হিস্পানিকরা তাঁকে দেবীর সম্মানে পূজা করে। ব্রেট রূপান্তরিত হন সবার “স্বপ্নের নারীতে।” সৌন্দর্য ও দুর্ভাগ্য ব্রেট চরিত্রের দুটি দিক আর এটাই তাঁর চরিত্রকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে জটিল করে তুলেছে।

ক্যাথেরিন ও মারিয়ার মত ব্রেটও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তাঁর অতীত জীবন হতাশার এক করুণ কাহিনী। উপন্যাসের অপ্রকাশিত প্রথম ভাগে ব্রেটের বিপর্যয়কর পরিস্থিতি প্রতিফলিত : “এলিজাবেথ ব্রেট মুরে নামে তাঁর জন্ম। নামের পদবী এসেছে তার দ্বিতীয় স্বামীর নাম থেকে। নানা কারণে প্রথম স্বামীকে পরিত্যাগ করেছেন তিনি। তাঁর স্কট স্বামীর মনে হয়েছিল, স্ত্রী বড়ই ব্যয়বহুল। দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে বর্তমানে তিনি বিচ্ছিন্ন, কারণ সে এক বদ্ধ মাতাল। একবার সে ব্রেটকে খুন পর্যন্ত করতে চেয়েছিল। পরে বিয়ে করবেন বলে যাকে ব্রেট ভেবেছিলেন সেও মেসোপটেমিয়ার যুদ্ধে মারা গেছে।”

ব্রেটের সুখের অন্বেষণ বিধ্বস্ত হয়েছে জীবন সম্পর্কে তাঁর অনভিজ্ঞতার কারণে। জীবনে তিনি ভালবাসা চেয়েছেন, ভালবাসতে চেয়েছেন, যুদ্ধ বিধ্বস্ত নৈতিকভাবে অধঃপতিত পৃথিবী তাঁর দমিত যৌনতাকে ভোগ করার সুযোগ দিয়েছে। হাসপাতালে নার্সের দায়িত্ব পালনকালে প্রচণ্ড আবেগে তিনি ভালবেসেছেন জ্যাককে, যদিও জ্যাকের আঘাতের পরিণতি সম্পর্কে তিনি সচেতন ছিলেন। তিনি জানতেন, যে কোন ধরনের দৈহিক মিলনে সে সম্পূর্ণ অক্ষম। তাঁর ট্রাজিক জীবনে এ আর এক বড় আঘাত।

আঘাত ও বেদনায় তিনি জর্জরিত এবং অনেকটা নিয়তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেই যেন তিনি অবাধ যৌনতায় সঁপে দিয়েছেন নিজেকে। ব্রেটের এই পদক্ষেপ শুধুমাত্র বিদ্রোহসুলভই নয়, বরং আত্ম-ধ্বংসকারী। তাঁর আচরণ এই ধারণাই দেয় যে তিনি তাঁর জীবনের গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছেন এবং হতাশায় নিজের জীবনকেই ধ্বংস করছেন। Roger Whitlow তার Cassandra’s Daughters গ্রন্থে এই মতবাদের সমর্থনে লিখেছেন

উপন্যাসে ব্রেট নিজেকে যতটা মারাত্মকভাবে আহত করেছেন আর কাউকেই ততটা করেননি। তাঁর সীমাহীন যৌনতা, মদ্যপান, হতাশা সেই লক্ষণসমূহই প্রকাশ করে যা আত্ম-ধ্বংসের একটি প্রক্রিয়া।

ব্রেটের হতাশা, বিদ্রোহ এবং ক্রমাগত আত্মধ্বংসকরণ তাঁকে আমেরিকান উপন্যাসের অন্যতম জটিল নারী চরিত্রে রূপান্তরিত করেছে। ব্রেট চরিত্রের এই জটিলতার বিবেচনায় তাঁকে দুঃশ্চরিত্রা নারী হিসেবে গণ্য করা অযৌক্তিক। সমালোচকরা সম্ভবত অভিধাটি ব্রেটের একটি উক্তি থেকেই গ্রহণ করেছেন। রোমেরোকে অবশেষে পরিত্যাগ করার সিদ্ধান্ত জ্যাককে জানানোর সময় ব্রেট বলেন, “দুঃশ্চরিত্রা নারী না হবার সিদ্ধান্ত নিতেও ভাল লাগে”; এই কথার মধ্যে ব্রেটের আত্ম-করুণার সুর সুস্পষ্ট। দৈহিকভাবে তিনি আকৃষ্ট হয়েছিলেন ষাঁড়-লড়াকু তরুণ রোমেরোর প্রতি।

The Sun Also Rises
The Sun Also Rises

ভালবাসার মানুষ জ্যাকের শারীরিক অক্ষমতাই তাঁকে বাধ্য করেছিল ঐ পথ বেছে নিতে। প্রেমিকের কাছে দেয়া এই আবেগময় বক্তব্যকে শাব্দিক অর্থে নিয়ে ব্রেটকে “দুঃশ্চরিত্রা নারী” হিসেবে বর্ণনা করা যায় না। ঐ ধরনের ঘৃণিত নারী ব্রেট কখনোই ছিলেন না। কোনের সঙ্গে সাময়িক সম্পর্কের প্রস্তাব ব্রেট দৃঢ়তার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেন। সত্যিকার দুঃশ্চরিত্রা নারী হলে ব্রেট তা কখনোই প্রত্যাখ্যান করতেন না। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের সঙ্গে ব্রেটের আচরণ একেবারেই সঙ্গতিপূর্ণ।

A Farewell to Arms উপন্যাসের নায়িকা ক্যাথেরিন জাতিগতভাবে ব্রিটিশ এবং তিনিও মনস্তাত্ত্বিক ধ্বংসের শিকার। ব্রেটের মত পেশায় তিনিও নার্স এবং আমেরিকান নায়ক হেনরীর সঙ্গে হাসপাতালে তাঁর দেখা। তাঁদের প্রথম আলাপের সময় ক্যাথেরিন মানসিকভাবে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত ছিলেন, কারণ তাঁর প্রেমিক যুদ্ধে মারা গেছে। রোমান্টিক সেই প্রেমিক যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল এই আশায় যে সামান্য আঘাত নিয়ে সে হাসপাতালে ভর্তি হবে এবং প্রেয়সীর সেবা পাবে। কিন্তু বাস্তবে যুদ্ধে বোমার আঘাতে ক্ষত বিক্ষত হয়ে তার মৃত্যু ঘটেছে।

ক্যাথেরিনের প্রচণ্ড দুঃখবোধের প্রধান কারণ প্রেমিকের ইচ্ছা সত্ত্বেও দৈহিক সম্পর্কে তিনি রাজি হননি। এই আচরণকে এখন তাঁর কাছে নিষ্ঠুর মনে হয়। অনেকটা প্রায়শ্চিত্ত হিসেবেই প্রেমিকের রেখে যাওয়া ছড়িটা তিনি সবসময় হাতে রাখেন। প্রথম দর্শনেই হেনরী মুগ্ধ হন ক্যাথেরিনের রূপ সৌন্দর্যে। হেনরী জীবনে কখনও প্রেমে বিশ্বাস করতেন না। নারী তাঁর কাছে সবসময় যৌনতার প্রতীক।

শহরের পতিতালয়ে তাঁর নিয়মিত যাতায়াত এবং ক্যাথেরিনকে দেখে তাঁর প্রথম অনুভূতি : ক্যাথেরিন ঐ সব মেয়েদের একটি চমৎকার বিকল্প। ক্যাথেরিনের মন মানসিকতা ভালভাবে না বুঝেই দ্বিতীয় দিন হেনরী ক্যাথেরিনের অন্তরঙ্গ হবার চেষ্টা করেন। সম্ভবত তিনিও ক্যাথেরিনকে দুঃশ্চরিত্রা নারী ভেবে চুম্বনে উদ্যত হন। কিন্তু ক্যাথেরিনের তীব্র প্রতিবাদ জানান প্রচণ্ড এক চড়ে, যা তাঁকে হতবুদ্ধি করে দেয়। আঘাতে চোখে পানি এসে যায় হেনরীর।

মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে ক্যাথেরিন দুঃখ প্রকাশ করেন তাঁর রূঢ় আচরণের। কিছুটা নিজের আচরণের কারণে এবং কিছুটা মানসিক স্বস্তি লাভের আশায়ও ক্যাথেরিন মনোভাব পাল্টে ফেলেন এবং বন্ধুসুলত আচরণ শুরু করেন হেনরীর সঙ্গে। হেনরীও ব্যাপারটিকে দাবার গুটির চাল ভেবে সাড়া দেন। ক্যাথেরিন এগিয়ে আসেন হেনরীর ইচ্ছা পূরণে এবং মানসিক ভারসাম্যহীনতায় সম্ভবত তিনি হেনরীকে তাঁর হারানো প্রেমিকের অবয়বে দেখতে পান।

The Sun Also Rises
The Sun Also Rises

কৌশলী হেনরী সে সুযোগ লুফে নেন এবং ক্যাথেরিনকে আলিঙ্গন করেন চরম আবেগে। ক্যাথেরিন তখন তাঁর ঘাড়ে মাথা রেখে কাঁদছেন। ক্যাথেরিনের পরবর্তী কথোপকথন স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে তিনি যেন মৃত প্রেমিকের সঙ্গেই কথা বলছেন, সদ্য পরিচিত হেনরীর সঙ্গে নয়।

“প্রিয়তম, তুমি আমার সঙ্গে ভাল ব্যবহার করবে, তাই না? কি অদ্ভুত জীবনযাপন করতে যাচ্ছি আমরা,”

ক্যাথেরিনের ধারণা, হেনরীর অবয়বে যেন তাঁর হারানো প্রেমিকই তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে এবং তার আগের শারীরিক সম্পর্কের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করার কারণে দুর্ব্যবহার করার সম্ভাবনা থাকায় তিনি ভাল ব্যবহার করার অনুরোধ করছেন। প্রেমিকের বিকল্প হেনরীর সঙ্গে সম্পর্ককে তিনি অদ্ভূত জীবনযাপন ভাবছেন। প্রেমিকের বিকল্প হেনরীকে তাঁর জিজ্ঞাসা :

“তুমি আমাকে ভালবাস?

“হ্যাঁ।

সাহিত্যে নারীজীবনের রূপায়ণ

তুমিতো বলেছিলে, তুমি আমাকে ভালবাসতে, তাই না?

“হ্যা।” (হেনরীর স্বীকারোক্তি “মিথ্যা বললাম”)।

ক্যাথেরিন আবার বলেন, “আমাকে ক্যাথেরিন নামে ডাক। বল, রাতে আমি কাছে ফিরে এসেছি… তুমি সত্যিই ফিরে এসেছ, তাই তুমি আবার চলে যাবে না তো?”

ক্যাথেরিনের এই কথাগুলো তাঁর মানসিক ভারসাম্যহীনতার স্পষ্ট নিদর্শন অবচেতন মনে তিনি ভীত, কারণ প্রেমিকের অনুরোধ তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, হয়ত ক্যাথেরিনকে ঘৃণা করে এবং কখনোই তাঁর নাম ধরে ডাকবে না। ক্যাথেরিনের সব জবাবেই হেনরী “হ্যাঁ” বোধক জবাব দিয়েছেন তাঁকে খুশী আশায়।

উপরের বিশ্লেষণে এটা স্পষ্ট যে মানসিকভাবে ক্যাথেরিনকে কখনোই স্বাভাবিক বলা যাবে না। মানসিকভাবে তিনি এতটা বিধ্বস্ত যে তাঁর আচরণে প্রচণ্ডভাবে অসংলগ্নতা দেখা যায়। সময়ের বিবর্তনে হেনরীর সঙ্গে ঘনিষ্ট সম্পর্ক ক্যাথেরিনের থেরাপির কাজ করে এবং তিনি দ্রুত তাঁর মানসিক ভারসাম্যহীনতা কাটিয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে তিনি বুঝতে পারেন তাঁর অসঙ্গত আচরণ। ক্যাথেরিন পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠার পর মিলান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন হেনরীকে বলেন,

“জীবনে অনেক দিন সুখ পাইনি, যখন তোমার সঙ্গে হল আমি তখন প্রায় অসংলগ্ন ছিলাম। সম্ভবত অসংলগ্নই ছিলাম।”

ক্যাথেরিনের অসংলগ্নতা হেনরীর দৃষ্টিতেও ধরা পড়েছে। উপন্যাসের শুরুতে ক্যাথেরিনের সঙ্গে প্রাথমিক যোগাযোগের পর্যায়ে হেনরীর স্বীকারোক্তি : “আমি সে কিছুটা অসংলগ্ন, সেটা হলেই ভাল, কি সম্পর্কে আমি জড়াচ্ছি তা নিয়ে অত ভাবি না।” পরবর্তীতে যুদ্ধক্ষেত্রে রওনা হবার আগে হোটেল কক্ষে হেনরীর অভিমত “আমি ভেবেছিলাম, তুমি অসংলগ্ন এক মেয়ে।” জবাবে ক্যাথেরিন বলেন:

“আমি কিছুটা অসংলগ্ন ছিলাম কিন্তু জটিল কোন ভাবে তা নয়।” Roger Whitlow ক্যাথেরিন সম্পর্কে যে নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন তা একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়: “হেমিংওয়ের যেসব চরিত্র মানসিক ভারসাম্যহীনতার ক্যাথেরিন তাদেরই একজন।”

সামগ্রিক মূল্যায়নে কখনোই ক্যাথেরিনকে দুঃশ্চরিত্রা বলা যাবে না। বরং উপন্যাসের এক চরিত্র রিনাল্ডি যেভাবে তাঁকে সম্বোধন করেছে : “সুন্দরী শান্ত দেবী,” তা যথার্থ। হেনরীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ককে ক্যাথেরিন ধর্মীয় পর্যায়ে নিয়ে বলেছেন : “তুমি আমার ধর্ম। তুমি আমার সব কিছু।” ক্যাথেরিনের আচরণে যে ঐকান্তিকতা ও আরাধনা দৃশ্যমান তা ওদের সম্পর্ককে ধর্মীয় আচার পরায়ণতার পর্যায়ে উন্নীত করে।

The Sun Also Rises
The Sun Also Rises

ক্যাথেরিনকে দুঃশ্চরিত্রা নারী বলার পেছনে ক্যাথেরিনের নিজস্ব সেই অনুভূতি অনেকটা দায়ী। সহসা তাঁর মনে হয়, তিনি যেন একজন পতিতা। হেনরীর যুদ্ধে ফিরে যাবার মুহূর্তে ক্যাথেরিনকে নিয়ে তিনি মিলান নগরীর এক হোটেলে ওঠেন। আসন্ন বিচ্ছিন্নতার বেদনায় ক্যাথেরিন উদ্বেলিত। যুদ্ধের শিকার তাঁর সাবেক প্রেমিকের স্মৃতিও তাঁকে পীড়িত করেছে নিঃসন্দেহে। তখন ক্যাথেরিনের মানসিক ভারসাম্য প্রায় স্বাভাবিক পর্যায়ে এবং তিনি অনুভব করেন যে বিবাহ বহির্ভূত শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে তিনি পতিতা-সুলভ আচরণ করছেন।

ক্ষুদ্ধ স্বরে তিনি হেনরীকে বলেন, “আগে নিজেকে কখনও পতিতা মনে হয়নি,” জবাবে হেনরী বলেন, “তুমি পতিতা নও।” হেনরীর ইতিবাচক জবাব ক্যাথেরিনের মনকে প্রভাবিত করে এবং তিনি উদ্বেগ দুঃশ্চিন্তা মন থেকে ঝেড়ে ফেলেন। হোটেল কক্ষটি একসময় তাঁদের নিজস্ব ঘরের অন্তরঙ্গতায় ভরে ওঠে। উপন্যাসের শেষাংশে ক্যাথেরিন যখন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন প্রসবজনিত অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে, হেনরী তখন অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে বিধাতাকে ডাকছেন। জীবনে যিনি কোনদিন ধর্ম বা বিধাতায় বিশ্বাস করতেন না, প্রিয়তমার জন্য তিনি জীবন ভিক্ষা চেয়েছেন বিধাতার একান্ত অনুরক্ত হিসেবে। কোন দুঃশ্চরিত্রা নারীর জন্য হেনরীর এই রূপান্তর অকল্পনীয়।

হেমিংওয়ের অন্যতম প্রধান উপন্যাস For Whom the Bell Tolls-এর কেন্দ্রীয় নারী চরিত্র মারিয়া জাতিতে হিস্পানিক। আমেরিকান নায়ক রবার্টের বিপরীতে তাঁকে উপস্থাপন করা হয়েছে। হিস্পানিকরা তাঁকে ‘রবার্তো’ নামে ডাকে। মারিয়ার দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি ব্রেট ও ক্যাথেরিনের তুলনায় অধিক ভয়াবহ। যুদ্ধ পরিস্থিতি ব্রেট ও ক্যাথেরিনকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করেছে, কিন্তু স্পেনের গৃহযুদ্ধ মারিয়াকে বিধ্বস্ত করেছে শারীরিক ও মানসিক দু’ভাবেই।

Roger Whitlow যথার্থই বিশ্লেষণ করেছেন যে ক্যাথেরিনের পরিস্থিতি তাঁকে মুখোমুখি করে শুধুমাত্র মনস্তাত্ত্বিক মৃত্যুর, কিন্তু মারিয়া একদিকে ফ্যাসিস্টদের হাতে শিকার হন দৈহিক মৃত্যুর, আর নির্মম অত্যাচারের পরিণতিতে শিকার হন মনস্তাত্ত্বিক মৃত্যুর । গৃহযুদ্ধ শুরু হবার আগে কিশোরী মারিয়া তাঁর পরিবারে বেড়ে উঠছিলেন স্বাভাবিকভাবেই। রিপাবলিকান দলের সমর্থক তাঁর বাবা ছিলেন শহরের মেয়র। ফ্যাসিস্টরা শুধুমাত্র তাঁর বাবা-মাকে মেরেই ক্ষান্ত হয়নি, নির্দয়ভাবে ধর্ষণ করার আগে মারিয়ার মাথার চুল কেটে ফেলেছিল।

বন্দী হিসেবে ট্রেনে স্থানান্তরের সময় গেরিলা পাবলোর নেতৃত্বে রিপাবলিকান যোদ্ধারা ট্রেন আক্রমণ করে তাঁকে উদ্ধার করে। শত্রুদের হাতে মারিয়া এতটাই নির্যাতিত হয়েছিলেন যে তিনি সদা সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। রিপাবলিকানদের সেবা যত্নে তিনি ক্রমে সুস্থ হয়ে উঠছিলেন। ঠিক এমন পরিস্থিতিতে এক গুহায় মারিয়া মুখোমুখি হন রবার্টের। রাফায়েলের বর্ণনায় মারিয়ার মানসিক অবস্থা ফুটে উঠেছে :

সে কথা বলত না এবং সবসময় কাঁদত। যদি কেউ তাকে স্পর্শ করত, সে প্রচণ্ডভাবে সন্ত্রস্ত হয়ে কাঁপত।

ব্রেট ও ক্যাথেরিনের মত মারিয়াও অপূর্ব সুন্দরী এবং তাঁর বিপর্যয়ের চেয়ে দৈহিক সৌন্দর্যই রবার্টকে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট করে। সরাসরি রবার্ট তাঁর অনুভূতি জানান মারিয়াকে : “মারিয়া, তোমাকে ভালবাসি, তুমি এত সুন্দর, এত চমৎকার যে ইচ্ছে হয় তোমাকে ভালবাসতে বাসতেই যদি মরতে পারতাম।” যদিও মারিয়া শারীরিক ও মানসিকভাবে ততটা পরিপক্ক নয়, রবার্টের অনুভূতি তাঁকে উজ্জীবিত করে। মন প্রাণ দিয়ে তিনি রবার্টকে ভালবাসেন এবং তাঁর অকৃত্রিম ভালবাসা রবার্টকে এগিয়ে নেয় তাঁর নির্ধারিত কাজ ব্রিজ ধ্বংস করার প্রচেষ্টায়।

The Sun Also Rises
The Sun Also Rises

Linda Patterson মারিয়া ও ক্যাথেরিনের মধ্যে একটা লক্ষণীয় সাদৃশ্যের কথা বলেছেন। উভয় রমণী নিজেদের পরিপূর্ণভাবে সঁপে দিয়েছেন প্রেমিকদের কাছে এবং দুজনে মিলেই পরিপূর্ণতা লাভ করেছেন। দুটি সত্তার একীভূত হওয়া তাঁদের পারস্পরিক প্রচণ্ড আবেগের ফসল। ক্যাথেরিন একবার হেনরীকে বলেছেন, “প্রিয়তম আমি তোমাকে এতটা ভালবাসি যে আমি তুমি হতে চাই।” অন্যত্র বলেছেন, “তুমি যা চাও তাই আমিও চাই। আমার নিজস্ব কোন সত্তা আর নেই।” একই অনুভূতি লক্ষণীয় মারিয়ার উচ্চারণে আমি তুমি, আর তুমি আমি। আমি তোমাকে ভালবাসি, প্রচণ্ড ভালবাসি। আমরা কি সত্যি এক হয়ে যাইনি?

… আমরা এখন এক হয়ে যাব আর কখনও আলাদা সত্তায় চিহ্নিত হব না। তুমি যখন থাকবে না, আমিই তুমি হয়ে যাব।” উপন্যাসের চরম পরিণতিমূলক ব্রিজ ধ্বংসের পর পশ্চাদপসরণের সময় মারাত্মকভাবে আহত হন রবার্ট। শোকাতুর মারিয়া এই ভেবে তাকে ত্যাগ করে চলে যান যে “যতক্ষণ দু’জনের মধ্যে একজন বেঁচে আছি, আসলে দুজনেই বেঁচে আছি।” কিন্তু এত কিছু মিল থাকার পরও ক্যাথেরিন ও মারিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য এই যে মারিয়া প্রতীকী চরিত্র।

মারিয়া শুধুমাত্র যুদ্ধ বিধ্বস্ত স্পেনের প্রতীকই নয়, রবার্টের আদর্শবাদের প্রতীকও মারিয়া, যে আদর্শবাদ প্রতিষ্ঠা করতে আত্মবিসর্জন দেন রবার্ট। মারিয়ার প্রতি তাঁর আবেগ যেন স্পেনের প্রতি তাঁর আবেগের অন্যরূপ : “আমি তোমাকে ততটাই ভালবাসি যতটা ভালবাসি আমাদের লক্ষ্যকে। স্বাধীনতা, সম্মান ও মানুষের অধিকারকে যতটা ভালবাসি ততটা ভালবাসি তোমাকে। মাদ্রিদকে যতটা ভালবাসি, যতটা ভালবাসি নিহত বন্ধুদের, তোমাকে ততটাই ভালবাসি।” Theodore Bardacke মারিয়াকে বর্ণনা করেছেন রাজনৈতিক সচেতনতার প্রতীক হিসেবে। তাঁর বিশ্লেষণ :

হেমিংওয়ে মারিয়ার মধ্যে ভিন্ন এক ক্যাথেরিনকে সৃষ্টি করেছেন দুজনের পার্থক্য শুধু রাজনৈতিক বিশ্বাস।

যদিও আহত সৈন্যদের সেবা করার জন্য ক্যাথেরিন নার্সের পেশায় নিয়োজিত, যুদ্ধের প্রতি তাঁর তেমন কোন দায়বদ্ধতা নেই। একইভাবে, যুদ্ধের প্রতি হেনরীরও কোন দায়বদ্ধতা নেই। তাই তাঁরা দুজনেই যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে যান নিজস্ব প্রেমের ভুবনে। কিন্তু মারিয়া ও রবার্ট স্পেনের গৃহযুদ্ধের প্রতি দায়বদ্ধ। রবার্ট এতটাই গৃহযুদ্ধের সঙ্গে একাত্ম হয়ে পড়েন যে তিনি তাঁর আমেরিকান নাগরিকত্বের ব্যাপারেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

The Sun Also Rises
The Sun Also Rises

নিজস্ব প্রেমের ভুবন রচনার চেয়ে তাঁরা নির্যাতিত মানুষের কল্যাণে আত্মোৎসর্গ করেন, যদিও তাঁদের প্রেমের বন্ধন কোন অর্থেই শিথিল ছিলনা। রাজনৈতিক সচেতনতা ও তা কার্যকর করার ক্ষেত্রে একাগ্রতা মারিয়া ও রবার্টের চরিত্র চিত্রণকে অনেক বেশী বাস্তবিক ও গ্রহণযোগ্য করেছে। মারিয়া যে দুঃশ্চরিত্রা নারী নয় তা রবার্টের কাছে এভাবে ব্যাখ্যা করে অগাস্টিন :

মারিয়াকে হাল্কাভাবে দেখনা। তোমার সঙ্গে ঘুমালেও সে পতিতা নয়। যা বলতে চাই তা হল তোমার সঙ্গে মেলামেশাকে মারিয়া হাল্কাভাবে নেয় না।

প্রবন্ধের সমাপ্তিতে ট্রাজেডি সম্পর্কে হেমিংওয়ের ধারণা এবং যে সব উপাদান ব্রেট, ক্যাথেরিন ও মারিয়ার জীবনকে ট্রাজেডিতে রূপান্তরিত করেছে তা পর্যালোচনা করা যায়। Wirt Williams তার The Tragic Art of Ernest Hemingway গ্রন্থে লিখেছেন :

জীবনকে ট্রাজেডি হিসেবে হেমিংওয়ে ঘোষণা করেছেন তাঁর রচনায় এবং প্রায় শুরু থেকেই নিজেকে ট্রাজেডির ভবিষ্যৎ বক্তা বলে মেনে নিয়েছেন।

আলোচ্য তিন ইউরোপীয় রমণী ট্রাজেডির শিকার হয়েছেন তাঁদের জীবনে। এ্যারিস্টটলের ধারণা থেকে হেমিংওয়ের ট্রাজিক ধারণা বেশ আলাদা। এ্যারিস্টটলের মতে Hamartia বা চারিত্রিক ত্রুটি সাধারণত জীবনে ট্রাজেডি ঘটায়। গ্রীক ধারণা Hubris বা অহঙ্কারের পাপ অথবা শেকস্পীয়রের Tragic flaw বা চারিত্রিক দুর্বলতার মত গতানুগতিক মাপকাঠিতে যুদ্ধ পরবর্তী হেমিংওয়ের পৃথিবীর ট্রাজেডি নির্ণয় অসম্ভব।

হেমিংওয়ের পৃথিবীতে মানবিক মনস্তত্ত্ব, নৈতিকতার অধঃপতন এবং জীবনের বিশৃঙ্খলা ট্রাজেডি নির্মাণে বিশেষ সহায়ক ভূমিকা পালন করে। হেমিংওয়ের নির্মাণ কৌশলের নিরিখে তাঁকে naturalist বা প্রকৃতিবদ্ধা বলা যায়। এই মতবাদের ভিত্তিতে, মানব প্রকৃতি বিশেষভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থার টানাপোড়েনে। পরিণতিতে, কোন ব্যাপারে দায়ী না হওয়া সত্ত্বেও একটি চরিত্র অনিবার্য পতনের শিকার।

ব্রেটের ক্ষেত্রে, তিনি ঘটনার শিকার যা তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ক্যাথেরিনের ত্রুটিপূর্ণ দৈহিক গঠন তাঁর করুণ মৃত্যুর জন্য বিশেষভাবে দায়ী, তবে এটা একটা দুর্ঘটনা যে সন্তান প্রসবজনিত রক্তক্ষরণে তাঁর মৃত্যু হয়। মারিয়ার ট্রাজেডির পেছনে রয়েছে বিশৃঙ্খল রাজনৈতিক পরিবেশ যা তাঁর “সামাজিক নিয়তিবাদ” হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। আর এভাবেই প্রধান তিন ইউরোপীয় রমণীর ভালবাসা ও সুখের অন্বেষণ ব্যর্থ হয়েছে হেমিংওয়ের কালজয়ী তিন উপন্যাসে।

 

হেমিংওয়ের প্রধান উপন্যাসে ইউরোপীয় রমণী
হেমিংওয়ের প্রধান উপন্যাসে ইউরোপীয় রমণী

 

সহায়ক-গ্রন্থ:

থিওডর ব্রাডাক: Hemingway’s Women পুনর্মুদ্রিত Ernest Hemingway : The Man and His Work, সম্পাদনা জন কে. এম. ম্যাকারী, নিউ ইয়র্ক Avon, ১৯৫০।

স্কট ডোনাল্ডসন: By Force of Will The Life and Art of Emest Hemingway, নিউ ইয়র্ক: Viking, ১৯৭৭।

প্যামেলা ফারলে Form and Function: The Image of Women in Selected Works of Hemingway and Fitzerald, পেনসিলভ্যানিয়া Pennsylvania State University, ১৯৭৩।

ক্যারোল এইচ. স্মিথ : Women and the Loss of Eden in Hemingway’s Mythology, Ernest Hemingway: The Writer in Context, সম্পাদনা জেমস নাজেল, মেডিসন Wisconsin University, ১৯৮৪।

রজার হুইটলো = Cassandra’s Daughters: The Wome in Hemingway, লন্ডন: Greenwood Press, ১৯৮৪

 

আরও পড়ুন:

ইসাবেলের আত্ম অন্বেষণ

“হেমিংওয়ের প্রধান উপন্যাসে ইউরোপীয় রমণী”-এ 2-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন