বাংলা নাট্যসাহিত্য [ রচনা, প্রবন্ধ রচনা ]

বাংলা নাট্যসাহিত্য [ রচনা, প্রবন্ধ রচনা ] বা

বাংলা নাটক ও নাট্যচর্চা রচনা বা

বাংলাদেশের নাটক বা নাট্য আন্দোলন প্রবন্ধ

বাংলা নাট্যসাহিত্য [ রচনা, প্রবন্ধ রচনা ]

 

বাংলা নাট্যসাহিত্য

ভূমিকা :

জাগতিক মানুষ যখন বাহ্যিক জগতের রূপ-রস-শব্দ-গন্ধ-স্পর্শের সাথে নিজের আত্মার মিল খুঁজে পায় আর সে মিলনের প্রভাবে যখন তার মনে সুর ও ভাবের সৃষ্টি হয়, তার শৈল্পিক প্রকাশই সাহিত্য। সাহিত্য মানুষের মনের খোরাক এবং এক হৃদয়ের সাথে অন্য হৃদয়ের মিলন ঘটানো বা একাত্মতার শ্রেষ্ঠতম মাধ্যম। নাট্যসাহিত্য বা নাটক হলো সাহিত্যের ভাব প্রকাশের অন্যতম একটি মাধ্যম বা উপায়।

নাটক কি? :

সংস্কৃত আলঙ্কারিকগণ নাটক বা নাট্যসাহিত্যকে কাব্যসাহিত্যের মধ্যে স্থান দিয়েছেন। তারা নাটককে দৃশ্যকাব্য বলে আখ্যায়িত করার প্রয়াস পেয়েছেন। দৃশ্যকাব্য সকল প্রকার কাব্যসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ। ‘কাব্যেষু নাটকং রম্যম্।’ নাটক দৃশ্য ও শ্রাব্যকাব্যের সমন্বয়ে রঙ্গমঞ্চের সাহায্যে গতিমান মানবজীবনের প্রতিচ্ছবি আমাদের সম্মুখে মূর্ত করে তোলে।

‘নাটক’ শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ অভিনয়যোগ্য সাহিত্যগ্রন্থ বা দৃশ্যকাব্য। সংস্কৃত ‘নট’ ধাতুর সাথে ‘অক’ (তৃ) প্রত্যয়যোগে ‘নাটক’ শব্দটি গঠিত। ‘নট’ শব্দের অর্থ নর্তক বা অভিনেতা বা কুশীলব। তাই অভিনয়যোগ্য দৃশ্যকাব্যকে ‘নাটক’ বলা হয়। Elizabeth Drew যথার্থই বলেছেন, “Drama is the creation of life in terms of the theatre.” জনৈক বিশেষজ্ঞ বলেন, “নট অন্যের রূপ ধারণ করে অভিনয় করে বলিয়া নাটকের নাম ‘রূপক’।”

সুতরাং দেখা যায় যে, রঙ্গমঞ্চের সাহায্য ব্যতীত নাটকীয় বিষয় পরিস্ফুট হয় না। নাট্যোল্লিখিত কুশীলবগণ তাদের অভিনয় নৈপুণ্যে নাটকের কঙ্কালসার দেহে প্রাণসঞ্চার করেন; তাকে বাস্তব রূপৈশ্বর্য দান করেন। দর্শকরা মঞ্চস্থ নাটকের অভিনয় একই সাথে দর্শন ও শ্রবণ করে সাহিত্যরস পান করার সুযোগ পান। তাই সাহিত্যের বিশেষ জনপ্রিয় শাখা নাটক।

 

 

নাটকের আঙ্গিক ও বৈশিষ্ট্য :

নাটক কথোপকথন বা সংলাপনির্ভর। নাটকে সাহিত্যিক বা নাট্যকার নিজে অনুপস্থিত থাকেন। নাটকের বিভিন্ন চরিত্রের সংলাপের মধ্য দিয়ে কাহিনী অগ্রসর হয়। কাহিনীর সমুদয় ঘটনাই দর্শকের চোখের সামনে সংঘটিত হয়। গল্প বা উপন্যাসে লেখক সমস্ত ঘটনার ধারাবাহিক বা নাটকীয় বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেন। চরিত্র চিত্রণও লেখকের দক্ষতার উপর নির্ভর করে। কিন্তু নাটকে যে কোনো চরিত্র তার আচার-আচরণ ও কথোপকথনের মধ্য দিয়ে নিজেকে চিত্রিত করে।

সনাতনপন্থী নাট্যকার ও সমালোচকগণ নাটকের তিনটি ঐক্যনীতির (Unities) কথা উল্লেখ করেছেন। যথা :

ক. সময়ের ঐক্য (Unity of Time) :

নাটকীয় আখ্যানভাগ রঙ্গমঞ্চে দেখাতে যতক্ষণ সময় লাগে, বাস্তব জীবনে সংঘটিত হতে যেন ততক্ষণই সময় লাগে এদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। Aristotle এ কাল নির্দেশ করতে গিয়ে একে ‘single revolution of the sun’ অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ করেছেন।

খ. ঘটনার ঐক্য (Unity of Action) :

নাটকে এমন কোনো দৃশ্য বা চরিত্র সমাবেশ থাকবে না, যাতে নাটকের মান ও সুর ব্যাহত হয়। সমস্ত চরিত্র ও দৃশ্যই নাটকের মূল বিষয় ও সুরের পরিপোষকরূপে প্রদর্শিত হওয়া চাই এবং নাটকটি যাতে আদি, মধ্য ও অন্ত সমন্বিত একটি অখণ্ড সৃষ্টিরূপে পরিস্ফুট হয়।

গ. স্থানের ঐক্য (Unity of Place) :

নাটকে এমন কোনো স্থানের উল্লেখ থাকবে না, যেখানে নাট্য নির্দেশিত সময়ের মধ্যে নাটকের কুশীলবগণ যাতায়াত করতে পারে না। অর্থাৎ নাটকে উল্লিখিত ঘটনাস্থল অবাস্তব হতে পারবে না।

এ তিন ধরনের ঐক্যের সমন্বয় সাধন করে যে নাটক রচিত হয়, তাকেই আদর্শ নাটক বলা যায়। তবে অনেক পণ্ডিত ও সমালোচক মনে করেন, এ তিনটি ঐক্যনীতি পালন করলে নাটকের স্বাভাবিকতা অনেক পরিমাণে ক্ষুণ্ন হয়। কারণ এতগুলো বিধি-নিষেধের মধ্যে মানব জীবনের স্বাধীন লীলা প্রদর্শন সম্ভবপর হয় না। ইংরেজি সাহিত্যে Ben Jonson এ ঐক্যনীতি মেনে চলেছেন এবং Shakespeare মাত্র The Tempest’ The Comedy of Errors’-এ এ নিয়ম মেনে চলেছেন। কিন্তু তিনি সর্বত্রই ঘটনার ঐক্য মেনে নাটকের মূল বিষয় পরিস্ফুট করেছেন। এতে তার নাটকের বৈচিত্র্য ও সজীবতা আরও উজ্জ্বল হয়েছে।

নাটকে বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি রূপায়িত হয়। এখানে অবান্তর প্রসঙ্গ বা অবাঞ্ছিত ঘটনার প্রবেশ আকাঙ্ক্ষিত নয়। জীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, ব্যথা বেদনা, প্রেম-ভালোবাসা, আশা-আকাঙ্ক্ষা, ইচ্ছা-অনিচ্ছা, মিলন-বিচ্ছেদ, জন্ম-মৃত্যু, উত্থান-পতন, ভালো-মন্দ প্রভৃতির প্রতিফলন ঘটে নাটকে। দর্শক বা পাঠক তার মনের আবেগ-অনুভূতিকে নাটকের বিষয়বস্তুর সাথে একীভূত করার সুযোগ লাভ করেন। তাই দর্শক বা পাঠকের গ্রহণ বা বর্জনের মাপকাঠিতে নাটকের উৎকর্ষ যাচাই হয়ে থাকে।

 

 

বাংলা নাট্যসাহিত্য :

বিশ্বের অন্যান্য দেশের নাট্যশিল্প সুদীর্ঘকালের ভাঙ্গাগড়া ও উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে। কিন্তু বাংলা নাটকের ইতিহাসে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য উত্থান-পতনের অধ্যায় নেই। শতাধিক বছরের স্বল্পবিস্তৃত সময়ে এর উদ্ভব, বিবর্তন ও বিকাশ সীমাবদ্ধ। ইংরেজি সাহিত্যের সাথে আমাদের প্রত্যক্ষ সংযোগের ফলেই এ দেশে বাংলা নাটকের আবির্ভাব ঘটে।

আধুনিককালে যাকে আমরা বাংলা নাটক বলি, প্রাচীন বাংলা সাহিত্যে তা ছিল না। যাত্রা, কথকতা, টপ্পা, খেউড়, হাঁফ, আখড়াই, মঙ্গলকাব্য, কবিগান প্রভৃতি প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের প্রধান সম্বল। তবে এ কথা সত্য যে, বাংলাদেশের চিরকালের নাটক ‘যাত্রা’। যাত্রা পুরনো কালের, নাটক নতুন কালের। বাংলা নাটকের কথা বলতে গেলে প্রথমেই মনে পড়ে এক বিদেশীকে। তার দেশ রাশিয়া এবং নাম গেরাসিম। অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে তিনি কলকাতায় আসেন। তিনি ‘ডিসগাইস’ নামে একটি প্রহসনের অনুবাদ মঞ্চস্থ করেন ১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দে। তাকে অনুসরণ করে এ দেশে গড়ে ওঠে মঞ্চ এবং নাটক লিখিত ও অভিনীত হতে থাকে।

বাংলা ভাষায় প্রথম মৌলিক নাটকটির নাম ‘ভদ্রার্জুন’। এটা একটি কমেডি। রচনা করেন তারাপদ শিকদার ১৮৫২ সালে। এ বছরই প্রকাশিত হয় যোগেন্দ্রচন্দ্র গুপ্তের প্রথম ট্রাজেডি ‘কীতিবিলাস’। ১৮৫৩ সালে হরচন্দ্র ঘোষের ‘ভানুমতি চিত্তবিলাস’ প্রকাশিত হয়। এরপর ১৮৫৪ সালে রামনারায়ণ তর্করত্ন লেখেন ‘কুলীনকুল সর্বস্ব’। একে বাংলা ভাষার প্রথম সামাজিক নাটক বলা যায়।

সংস্কৃত ও ইংরেজি প্রভাবিত রামনারায়ণ তর্করত্নের পর মধুসূদন দত্ত ও দীনবন্ধু মিত্র বাংলা নাটকে যুগান্তর আনয়ন করেন। মধুসূদনের রচিত উল্লেখযোগ্য নাটক হলো শর্মিষ্ঠা’, ‘পদ্মাবতী’, ‘কৃষ্ণকুমারী’ ভাষায় প্রথম আধুনিক নাটক। নাটক ‘কৃষ্ণকুমারী’। তিনি ব্যঙ্গ বিদ্রুপাত্মক সামাজিক প্রহসনও লিখেন দুটি—’একেই কি বলে সভ্যতা’ ও ‘বুড়ো ঘাড়ে রোঁ’। মধুসূদনের পদাঙ্ক অনুসরণ করে বাংলা নাটক উন্নতির দিকে এগিয়ে চলে। মধুসূদনের সমসাময়িক নাট্যকার দীনবন্ধু তার ‘নীলদর্পণ’; ‘লীলাবতী’, ‘সধবার একাদশী’ প্রভৃতি নাটক প্রহসন রচনা করেন। দীনবন্ধু মিত্রের পরে মনমোহন বসু, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, রাজকৃষ্ণ রায় প্রমুখ নাট্যকারেরা রচনা করে খ্যাতি লাভ করেন। সময়ে মীর মোশাররফ হোসেন ‘বসন্তকুমারী’ এবং ‘জমিদার দর্পণ’ নাটক রচনা করে খ্যাতিলাভ করেন।

বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাসে একটি চিরস্মরণীয় নাম গিরিশচন্দ্র ঘোষ। তিনি একাধারে নাট্যকার ও অভিনেতা। তার রচিত পৌরাণিক নাটক ‘অভিমন্যুবধ’, ‘জনা’; ঐতিহাসিক নাটক ‘কালাপাহাড়’, ‘সিরাজ-উ-দ্দৌলা’; সামাজিক নাটক ‘বলিদান’ বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। গিরিশচন্দ্র ঘোষের পর নাট্যকার অমৃতলাল বসুর অবদান উল্লেখযোগ্য। তার রচিত ‘হরিশচন্দ্র’, ‘তরুবালা’, ‘বিবাহ বিভ্রাট’, ‘অবতার’ প্রভৃতি নাটক বাংলা নাট্যসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। এ সময়কার উল্লেখযোগ্য নাট্যকার হলেন দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। তার রচিত ঐতিহাসিক নাটক ‘চন্দ্রগুপ্ত’, ‘নূরজাহান’ ও ‘শাজাহান’ প্রভৃতি শ্রেষ্ঠ নাটক বাংলা নাট্যসাহিত্যে নবযুগের সূচনা করে। এ সময়ে ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ কিন্নরী’, ‘রঘুবীর’, ‘প্রতাপাদিত্য’ প্রভৃতি নাটক লিখে যথেষ্ট খ্যাতিলাভ করেন।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাট্যসাহিত্যে বেশ কয়েকটি নতুন ধারার প্রবর্তন করেন। তিনি বাংলা নাটকের গতি পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি সাফল্যের অধিকারী। গীতিনাট্য, কাব্যনাট্য, নৃত্যনাট্য, সাংকেতিক নাটক প্রভৃতি নাট্যশাখা তিনিই সংযোজন করেন। রবীন্দ্রনাথের ‘বিসর্জন’, ‘রাজা’, ‘ডাকঘর’, রক্তকরবী’, ‘কালের যাত্রা’, ‘চিত্রাঙ্গদা’, ‘চণ্ডালিকা’, ‘শ্যামা’, ‘শেষ রক্ষা’, বৈকুণ্ঠের খাতা প্রভৃতি নাট্যসাহিত্যের বিভিন্ন শাখা সমৃদ্ধ করেছে। রবীন্দ্রনাথের পর থেকে বাংলা নাটক বিভিন্ন নাট্যকারের প্রতিভাকে আশ্রয় করে উত্তরোত্তর সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

 

 

বাংলাদেশের নাটক :

দেশবিভাগের পূর্বে (১৯৪৭-এর পূর্বে) পূর্ব বাংলায় মীর মোশাররফ হোসেন, কাদের আলী, আব্দুল করিম প্রমুখ নাট্যকার নাটক রচনা করে খ্যাতি অর্জন করেন। ইব্রাহিম খাঁ, শাহাদাৎ হোসেন, আবুল ফজল, আকবর উদ্দিন, নূরুল মোমেন, কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখ নাট্যকারও এ সময় নাটক রচনা শুরু করেন। শাহাদাৎ হোসেনের ‘নবাব আলীবর্দী’ ও ‘আনারকলি’, আকবর উদ্দীনের ‘সিন্ধু বিজয়’, ইব্রাহিম খাঁর ‘আনোয়ার পাশা’ ও ‘কামাল পাশা’, নূরুল মোমেনের ‘নেমেসিস’, আবুল ফজলের ‘আলোকলতা’, কাজী নজরুল ইসলামের ‘ঝিলিমিলি’ ‘’আলেয়া’ বাংলা নাট্যসাহিত্যে বিশেষ স্থান দখল করে আছে।

দেশবিভাগের পর (১৯৪৭-এর পর) আনন্দমোহন বাগচীর ‘মসনদ’, আ. ন. ম. বজলুর রশীদের ‘মেহের নিগার’, আবুল ফজলের ‘কায়েদে আযম’, আসকার ইবনে শাইখের ‘অগ্নিগিরি’, ইব্রাহিম খলিলের ‘স্পেন বিজয়’, ইব্রাহিম খাঁর ‘ঋণ পরিশোধ’ ও ‘কাফেলা’, মুনীর চৌধুরীর ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’ ও ‘কবর’, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘বহ্নিপীর’, আলী মনসুরের ‘পোড়াবাড়ী’, আনিস চৌধুরীর ‘মানচিত্র’ প্রভৃতি নাটক সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে আবদুল্লাহ আল-মামুন, সৈয়দ শামসুল হক, মমতাজ উদ্দিন আহমদ, মামুনুর রশীদ, সেলিম আল-দীন, রশীদ হায়দার, মমতাজ হোসেন প্রমুখ নাট্যকার নাটক রচনা করে চলেছেন। আবদুল্লাহ আল মামুনের ‘সুবচন নির্বাসনে’, ‘এখনও দুঃসময়’, ‘ওরা কদম আলী’ এবং সৈয়দ শামসুল হকের ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য মঞ্চনাটক।

 

 

বাংলা সাহিত্যে নাটকের অভাব :

ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে আরম্ভ করে আজ পর্যন্ত বাংলা উপন্যাস, ছোটগল্প, গীতিকবিতা ও প্রবন্ধ প্রভৃতিতে যে চরম উৎকর্ষ লাভ ঘটেছে, দুঃখের বিষয় বাংলা সাহিত্যে নাটকের বা নাট্যসাহিত্যের সে অনুযায়ী উৎকর্ষ ঘটেনি। নাট্যসাহিত্যের বিকাশের অভাবের কতিপয় যে কারণ চিহ্নিত করা যায়, তা নিম্নরূপ :

১. পরিমিত সংখ্যক নাট্যশালার অভাব।

২. উচ্চশ্রেণীর নাটকীয় প্রতিভার অভাব।

৩. নাটক একটি অত্যন্ত কঠিন শিল্পকর্ম।

৪. অভিনেতা-অভিনেত্রী, সহৃদয় সামাজিকবর্গ ও নিজের মধ্যে ঐক্য স্থাপনের অভাব।

৫. বাংলা সাহিত্য সাধকগণের মধ্যে তন্ময় অপেক্ষা মন্ময় দৃষ্টি গভীরতর বলে তা নাট্য সৃষ্টির অনুকূল হতে পারেনি।

৬. জাতি হিসেবে বাঙালি অতিমাত্রায় ভাবপ্রবণ ও গান প্রিয়। ভাবপ্রবণতা নাটকের পরিপন্থী।

৭. জীবনযুদ্ধে আত্মপ্রতিষ্ঠার জন্য যে শক্তি, সাহস, নিষ্ঠা ও সংযমের প্রয়োজন তা বাঙালির চরিত্রে বহুদিন ধরেই অনুপস্থিত।

৮. প্রতিভার অভাব নয়; বরং সুস্থ সক্রিয় জীবনদর্শনের অভাবই আমাদের নাট্যসাহিত্যের দারিদ্র্যের কারণ।

৯. নাটক বোঝার মতো শিক্ষিত রুচি ও মনোবৃত্তি আমাদের এখনও সৃষ্টি হয়নি।

বর্তমান নাট্যসাহিত্যের প্রসার সম্প্রতি বাংলাদেশের নাট্যসাহিত্যে উন্নতির হাওয়া বইছে। নাট্যচর্চার ক্ষেত্র যথেষ্ট প্রসার লাভ করছে। ঢাকাসহ সারা দেশে অসংখ্য নাট্যগোষ্ঠী গড়ে উঠেছে এবং নিয়মিত নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে। রেডিও ও টিভিতে নাটক প্রচারিত হচ্ছে। বাংলা একাডেমী প্রতিবছর একজন নাট্যকারকে পুরষ্কৃত করছে। এছাড়াও শিল্পকলা একাডেমী নাট্য উৎসবের আয়োজন করছে। মাঝে মাঝে বিটিভিতে মঞ্চনাটক প্রচারিত হচ্ছে। দিন দিন নাটকের দর্শক সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। নাট্যসাহিত্য উন্নয়নের জন্য সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে; যেমন–মঞ্চ স্থাপন, নাট্য গোষ্ঠীকে নাট্যচর্চায় আর্থিক সাহায্য দান, নাট্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। তবে বর্তমান সময়ে নাট্যচর্চায় আশাব্যঞ্জক অনুকূল পরিবেশের সৃষ্টি হচ্ছে।

 

উপসংহার :

বাংলা নাট্যসাহিত্য সমৃদ্ধশালী না হলেও আমরা আশাবাদী। আমাদের সাহিত্যে শেক্সপীয়র নেই বলে দুঃখ করে লাভ নেই। অদূর ভবিষ্যতে আমাদের সাহিত্যেও যে এমন প্রতিভার আবির্ভাব ঘটবে না তা কেউ বলতে পারে না। তবে এ কথা সত্য যে, আমাদের জীবনে নতুন শিক্ষিত সুস্থ সমাজ চৈতন্য না আসা পর্যন্ত নাট্যসাহিত্য সম্বন্ধে আশান্বিত হবার কোনো কারণ নেই। তবুও আমরা নাট্যসাহিত্যের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের প্রতি যথেষ্ট আশাবাদী।

আরও পড়ুন:

হেমিংওয়ের প্রধান উপন্যাসে ইউরোপীয় রমণী

“বাংলা নাট্যসাহিত্য [ রচনা, প্রবন্ধ রচনা ]”-এ 7-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন