ও’ নীলের বিপর্যস্ত নায়িকা নীনা – সৈয়দ আনোয়ারুল হক

ও’ নীলের বিপর্যস্ত নায়িকা নীনা – সৈয়দ আনোয়ারুল হক : বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে ইউজীন ও নীল জীবনমুখী নাটক রচনার মাধ্যমে আমেরিকান নাট্য সাহিত্যে একটি নতুন ধারার সৃষ্টি করেন। Beyond the Horizon, Desire Under the Elms এবং Welded নাটকের জীবনমুখী কাহিনীতে প্রেম অত্যাবশ্যকীয় একটি অনুষঙ্গ। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রেমের পরিণতি ব্যর্থতায়। Strange Interlude নাটকে প্রেমের ব্যর্থতাই প্রধান উপজীব্য বিষয় এবং এর পরিণতিতে মানসিকভাবে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত নায়িকা নীনা লীডসের যৌন অভিযান সমকালীন সাহিত্য সমালোচনায় বিশেষ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।

Strange Interlude নাটকে নীনাকে উপস্থাপিত করা হয়েছে প্রেমে ব্যর্থ, আত্মগ্লানিতে জর্জরিত এক বিপর্যস্ত তরুণীর অবয়বে। প্রথম যৌবনে প্রেমিকের আবেগের প্রেম, পরবর্তীতে বাবার নিষ্কাম প্রেম এবং পরিশেষে দৈহিক প্রেম — সকল ক্ষেত্রেই ব্যর্থ নীনা। ব্যর্থ প্রেমের যন্ত্রণা ভুলতে তিনি নিজেকে সমর্পণ করেন এক ধরনের যৌন অভিযানে। শৈশব কালেই নির্ধারিত হয় নীনার প্রেমহীন জীবনের নীল-নকশা। তখন থেকেই কঠোর নীতিবাগিশ ও দখলী মনোভাবের বাবার প্রতি নীনা অতিমাত্রায় অনুরক্ত হয়ে পড়েন। কলেজ অধ্যাপক বাবা তাঁর স্ত্রীকে হারিয়ে জীবনের শেষ বন্ধন বিবেচনায় কন্যার প্রতি গভীর অনুরাগে যত্নবান হন।

পরিণতিতে, নীনা বাবার ইচ্ছা-অনিচ্ছার শিকারে রূপান্তরিত হন। আমেরিকার নিউ ইংল্যান্ডের কঠোর নীতিবাগিশ পরিবেশ এবং বাবার কট্টর শাসনে নীনা বাধ্য হন তাঁর কৈশোরের যৌন অনুভূতিকে অবদমিত করতে। সবুজাভ নীল চোখের লাস্যময়ী নীনা অন্তর্দ্বন্দ্বে দগ্ধীভূত হন নিরন্তর। প্রচণ্ড অনুরাগ সত্ত্বেও ক্রমে বাবার প্রতি তিনি কিছুটা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং বাবাকে ঘৃণা করতে শুরু করেন। অধ্যাপক লীডস একদিন কথা প্রসঙ্গে তাঁর বন্ধু মারসূডেনকে বলেন : “অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, তবে নীনা আজকাল আমার সঙ্গে এমন ব্যবহার করছে যেন সে আমাকে ঘৃণা করে” (১ম অঙ্ক)।

[ ও’ নীলের বিপর্যস্ত নায়িকা নীনা – সৈয়দ আনোয়ারুল হক ]

বাবার অনুমান যথার্থ, এবং ঘৃণার কারণটি ঘটিয়েছেন তিনি নিজেই। নীনা প্রচণ্ড ভালবেসেছেন গর্ডনকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সৈনিক হিসেবে যোগদানের আগেই নীনা তাঁকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কঠোর বাবা নীনার এই ইচ্ছাকে “অবিবেচনা প্রসূত” আখ্যা দিয়ে নাকচ করে দেন, গর্ডনকে ডেকে বলেন, “এ বিয়ে নীনার জন্য হবে অন্যায় আর নিজের জন্য অসম্মানজনক।” এই যুক্তির স্বপক্ষে তিনি আরো বলেন, “যুদ্ধে গর্ডনের মৃত্যুর যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। সেক্ষেত্রে নীনা হয়ে যাবে বিধবা, সম্ভবত তাঁর বাচ্চাসহ। কোন আর্থিক সঙ্গতি না থাকায় ওরা হবে সম্বলহীন অথচ সুন্দরী নীনার জীবনের বড় একটা অংশ তখনও সামনে পড়ে থাকবে” (১ম অঙ্ক)।

নীনার মঙ্গলের কথা ভেবে গর্ডন এতে সম্মত হয় এবং যুদ্ধে চলে যায়। বাবার আশঙ্কাকে সত্যে রূপান্তরিত করে গর্ডন যুদ্ধে নিহত হয়। শোকে দুঃখে নির্বাক হয়ে যান নীনা। মানসিক বিপর্যস্ততায় তার অনুধাবন হয়: বাবা ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁর জীবনের সব সুখ ধ্বংস করে দিয়েছেন। আসলে বাবা গর্ডনের মৃত্যুই চেয়েছিলেন এবং তা বাস্তবায়িত হওয়ায় গোপনে পুলকিত হয়েছেন। নীনার মানসিক যন্ত্রণা তাঁকে আরো বেশী পীড়ন করে এই ভাবনায় যে যুদ্ধে যাবার আগে গর্ডনের সঙ্গে দৈহিক মিলনের মাধ্যমে তাঁর প্রেমকে সার্থক করতে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি।

হেমিংওয়ের A Farewell to Arms উপন্যাসে ক্যাথেরিন একইভাবে মানসিক যন্ত্রণায় জর্জরিত হয়েছেন একই কারণে। তিনিও তার সৈনিক প্রেমিকের সঙ্গে দৈহিক মিলনের মাধ্যমে প্রেমকে সার্থক করতে ব্যর্থ হয়েছেন প্রেমিকের আকস্মিক নিহত হবার ঘটনায়। ক্যাথেরিন যেমন পরবর্তীতে হেনরির কাছে নিজেকে দৈহিকভাবে সমর্পণ করেছিলেন আত্মগ্লানিতে, একইভাবে নীনাও যুদ্ধাহত সৈনিকদের মাঝে নিজেকে সমর্পণ করেন। নার্স হিসেবে তিনি স্যানাটরিয়ামে গর্ডনের সহযোদ্ধাদের শুশ্রূষা করার নামে আসলে তিনি তাদের কাছে নিজেকে দৈহিকভাবে সমর্পণ করছিলেন অতীত ভুলের প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে। এ প্রক্রিয়ায় তিনি নিজে যৌনতৃপ্তি পেলেও তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল গর্ডনের সহযোদ্ধাদের যৌন তৃপ্তি দেয়া।

কিন্তু ক্রমে নীনা এই কার্যক্রমের অর্থহীনতা বুঝতে পারেন। অপরাধবোধ থেকে মুক্তি পাবার পরিবর্তে এটা তাঁর মানসিক অস্থিরতা আরো বাড়িয়ে দেয়। এক বছর পর বাবার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে স্যানাটরিয়াম ছেড়ে নীনা ঘরে ফেরেন। নীনার অনুভূতিতে বাবার মৃত্যু কোন দুঃখবোধ জাগায় না। নীনার অপকট উচ্চারণ : “দুঃখিত বাবা .. আমার কাছে তুমি দীর্ঘ দিন ধরেই মৃত

গর্ডনের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে আমার কাছে সব মানুষই মৃত। আমার জন্য তুমি কি অনুভব করেছ? কিছুই না তোমার প্রতি এখন আমার অনুভূতিও কিছুই না” (২য় অঙ্ক)। বাবার বন্ধু মারস্‌ডেন নীনার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন বাবার বিকল্প হিসেবে। তিনিও বাবার মত নীনাকে নিজ অধিকারে রাখতে চান। তবে মারডেনের ভাবনার মধ্যে যৌনতার সুর স্পষ্ট : “আমি আশা করেছিলাম শোকে নীনা আমাকে আলিঙ্গন করবে; ঘাড়ে মুখ লুকিয়ে বলবে “চার্লি পৃথিবীতে তুমিই আমার সব” (২য় অঙ্ক)।

চিকিৎসক ড. ড্যারেলের সঙ্গে নীনার ঘনিষ্ট মেলামেশায় মারসূডেন ঈর্ষান্বিত। ড. ড্যারেল ও স্যাম ইভান্‌স গর্ডনের বন্ধু। বর্তমানে স্যাম পাগলের মত ভালবাসে নীনাকে। ড. ড্যারেল প্রেম ও যৌনতার ব্যাপারে বৈজ্ঞানিক ধারণায় বিশ্বাস করেন এবং নিজেকে প্রেমের ভুবন থেকে মুক্ত মনে করেন। অপরদিকে স্যাম শারীরিক পরীক্ষায় ব্যর্থতার কারণে গর্ডনের সেনা ইউনিটে ঢুকতে না পারায় এক ধরনের হীনমন্যতায় ভোগে।

আত্মবিশ্বাস বলতে তার কিছুই নেই। নীনার প্রতি তার প্রচণ্ড ভালাবাসার কারণে সে নীনার দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়েই সুখী হতে চায়। স্যাম ভাবে, “প্রয়োজনে প্রাতঃরাশ তৈরী করবে, তার চুল আচড়ে দেবে এবং চুলে চুমু দিয়েই সুখী হবে” (২য় অঙ্ক)। স্যামের ধারণা, ড. ড্যারেল নীনাকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন স্যামকে বিয়ে করতে। কারণ নীনার জীবনের জটিলতা কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজন স্বাভাবিক প্রেমের পরশ। মার্স্‌ডেনকে পিতৃতুল্য ভেবে স্যাম তাঁর কাছেই নীনাকে বিয়ের অনুমতি চায়।

মার্স্‌ডেনের স্বার্থপর ভাবনার বিশ্লেষণ : ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজের পক্ষেই যাবে। মারসডেন নিশ্চিত, বিয়ের পর প্রিয়দর্শিনী বুদ্ধিমতী নীনা গোবেচরা স্বামী পরিত্যাগ করে তাঁর কাছেই ফিরে আসবে। অসহায়তায় ভেঙ্গে পড়ে নীনা যখন মার্স্‌ডেনের বুকে মুখ রাখেন, মার্স্‌ডেন উপভোগ করেন সেই স্পর্শ; সান্ত্বনা দেবার ছলে আরো ঘনিষ্ট হবার চেষ্টা করেন। কিন্তু অন্তরঙ্গ মুহূর্তে নীনা যখন অকপটে স্বীকার করেন যুদ্ধাহত সৈনিকদের যৌনতৃপ্তি দেবার কথা, মারস্‌ডেন তখন আহত বোধ করেন।

নিজ পরিকল্পনা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে তিনি নীনাকে পরামর্শ দেন স্যামকে বিয়ে করতে। সান্ত্বনা দেন দ্বিধান্বিত নীনাকে “যখন বাচ্চা হবে, জীবনে সত্যিকার প্রেম আসবে।” মার্স্‌ডেনের পরামর্শে নীনা স্যামকে নিয়ে দাম্পত্য জীবনের স্বপ্ন দেখেন। স্যামের প্রতি তেমন অনুরাগ না থাকার পরও তিনি স্যামকে বিয়ে করেন।

নীনার বিবাহোত্তর জীবন কাটে পরম আনন্দে। তিনি সন্তানসম্ভবা হন প্রকৃতির নিয়মে। সহসা নীনার দেখা হয় স্যামের মা মিসেস ইভানূসের সঙ্গে। তাদের মধ্যে কথা হয় আগত সন্তান সম্পর্কে। এ ব্যাপারে মিসেস ইভাসের প্রতিক্রিয়ায় স্তম্ভিত হয়ে যান নীনা। তাঁর সুখী দাম্পত্য জীবনের স্বপ্ন মুহূর্তেই ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়। মিসেস ইভাস জানান, স্যামদের পরিবারে উত্তরাধিকার সূত্রে পাগলামী রোগ রয়েছে এবং নীনার সন্তানের পাগল হবার যথেষ্ট সম্ভাবনা।

প্রচণ্ড মুষড়ে পড়া নীনাকে তিনি বলেন, স্যামের সন্তানের মা হওয়া হবে “একটি অপরাধ, হত্যাকাণ্ডের চেয়ে ভয়ঙ্কর অপরাধ” (৩য় অঙ্ক)। বিষয়টি নীনাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। তিনি স্যামকে পরিত্যাগ করার কথা বলেন। মিসেস ইভান্‌স তখন সমস্যাটির সমাধান দেন এভাবে: নীনা স্যামের সঙ্গেই সংসার করবে, তবে স্বাস্থ্যবান কোন পুরুষকে বেছে নেবে স্বাস্থ্যবান সন্তানের পিতা হিসেবে ….. সুখী হওয়া — খুবই ভালো।

বাকীটা গল্প কথা … স্যামকে বোঝাতে হবে তুমি তাকে ভালবাস। সুখী হবার জন্য তাকে সুখী করতে তুমি যা করবে তার সবই ভালো ভালো নীনা। যেভাবেই তা তুমি কর তাতে আমার কিছু আসে যায় না। আসল কথা তোমাকে স্বাস্থ্যবান শিশু পেতে হবে যাতে তোমরা দুজনেই সুখী হতে পার। আর তাই তোমার যথার্থ দায়িত্ব” (৩য় অঙ্ক)।

স্বাস্থ্যবান শিশুর অন্বেষণ নীনাকে চালিত করে ড. ড্যারেলের সঙ্গে এক সমঝোতায় যেতে। দাম্পত্য প্রেমের ব্যর্থতা তাঁকে নিয়ে যায় ডাক্তারের সঙ্গে এক অবৈধ প্রেমের সম্পর্কে। নীনা তাঁর সমস্যার কথা খুলে বলেন ড. ড্যারেলকে। ব্যাখ্যা করেন উত্তরাধিকার সূত্রে স্যামদের পরিবারে পাগলামী রোগ থাকার কারণে গর্ভপাতের অবশ্য প্রয়োজনীয়তার কথা। নীনার প্রতি কিছুটা দুর্বলতার কারণে ড. ড্যারেল এগিয়ে আসেন তাঁর সাহায্যে। তিনি প্রথমে পরামর্শ দেন ডিভোর্সের, যা নীনার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

নীনা তাঁর কাছে সমস্যাটির বৈজ্ঞানিক সমাধান দাবী করেন, বলেন স্বাস্থ্যবান এক পুরুষের প্রয়োজনীয়তার কথা। কিন্তু নীনার ইঙ্গিত বুঝতে ব্যর্থ হন ড. ড্যারেল। নীনা তখন তাঁকে স্মরণ করিয়ে দেন একদিন নীনাকে তাঁর অন্তরঙ্গ আলিঙ্গন ও চুম্বনের কথা। এবার ব্যাপারটা বুঝতে পারেন ড. ড্যারেল। মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেন পরবর্তী কার্যক্রমের এবং তাঁর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেন এভাবে:

“ল্যাবরেটরিতে বৈজ্ঞানিক প্রয়োজনে তিনি পালন করবেন এক স্বাস্থ্যবান গিনিপিগের ভূমিকা”

(৪র্থ অঙ্ক)। বৈজ্ঞানিক প্রয়োজনে এভাবেই শুরু হয় ড. ড্যারেলের সঙ্গে নীনার অবৈধ প্রেম। উদ্দেশ্য একটাই, আবার নীনার সন্তানসম্ভবা হওয়া কারণ মাতৃত্বের স্বাদ পেতে নীনা ব্যাকুল। কিন্তু চলমান বৈজ্ঞানিক এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ড. ড্যারেলের সঙ্গে সত্যিকার প্রেমে পড়ে যান নীনা। আর ড. ড্যারেলও উপলব্ধি করেন, তাঁর কার্যক্রম বৈজ্ঞানিক কার্যক্রমকে ছাড়িয়ে হৃদয়ের আবেগে আটকা পড়েছে :

নীনা : (প্রচণ্ড আবেগে) আমি তোমাকে ভালবাসি। আমি আর লুকাতে পারছি না। আমি লুকাতেও চাই না। আমি তোমাকে ভীষণ ভালবাসি। ড্যারেল (তাকে ঘনিষ্ট আলিঙ্গনে চুম্বনরত অবস্থায় ) নীনা, তুমি এত সুন্দরী!

নীনা :

ড্যারেল: (প্রচণ্ড আবেগে) হ্যাঁ, ঠিক তাই। (৪র্থ অঙ্ক)

(চুম্বনরত অবস্থায় বিজয়িনীর সুরে) তুমিও আমাকে ভালবাস, তাই না? বল, তুমি বল ।

অবশেষে মনের আবেগের কথা স্বীকার করলেও নীনাকে বিয়ে করতে অস্বীকার করেন ড. ড্যারেল। নীনার অজান্তে হঠাৎ তিনি ইউরোপে সমুদ্রযাত্রা করেন। এখানে ড. ড্যারেলের ভূমিকা অবশ্যই পলায়নবাদী এক কাপুরুষের, যে তার আবেগ ও যুক্তির সংঘাত সমাধানে ব্যর্থ হয়ে পালিয়ে গেছে। ড. ড্যারেলের আকস্মিক প্রস্থানে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েন নীনা, লুটিয়ে পড়েন মেঝেতে। পরবর্তীতে যদিও ড্যারেলের ঔরসজাত সন্তান নীনার জীবনের সব আনন্দের কেন্দ্রবিন্দুতে রূপান্তরিত হয়, কিন্তু হারানো প্রেমের যন্ত্রণায় নীনা দক্ষিভূত হন।

মারস্‌ডেন যখন নীনাকে বলেন যে মিউনিকে এক অনিন্দ্য সুন্দরীর সঙ্গে ড. ড্যারেলকে দেখেছেন, অবচেতন ভাবেই নীনা এ ব্যাপারে তীব্র প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেন। মারসডেন তাতে সন্দিহান হন ড. ড্যারেলের সঙ্গে নীনার সম্পর্কের ব্যাপারে। মারসূডেনকে শান্ত করার জন্য নীনা মারস্‌ডেনের হাত নিজের হাতে তুলে নেন। কিন্তু মারসূডেন যে প্রচণ্ড আবেগে নীনার দুহাত চেপে ধরেন তাতে নীনা মারস্‌ডেনের সুপ্ত অনুভূতির প্রকাশ দেখে স্তম্ভিত হয়ে যান।

নীনার মনে তখন বিক্ষিপ্ত ভাবনা : “এও কি সম্ভব তিনি আমাকে ভালবাসেন? এ ভাবে? কি বিরক্তিকর ভাবনা? এটা তো এক অজাচারী সম্পর্ক” (৪র্থ অঙ্ক)। এদিকে নীনার প্রতি তীব্র কামনায় ড. ড্যারেল ইউরোপ থেকে ফিরে আসেন, যা দেখে মারসূডেন হন প্রচণ্ড রুষ্ট। নীনা ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করেন এভাবে: স্যামের

চেয়ে ভালো স্বামী আমি পেতাম না… জীবনে সুখের জন্য দুজনকেই আমার প্রয়োজন” (৪র্থ অঙ্ক)। এরপর স্যামকে ছেড়ে ড্যারেলকে বিয়ে করার ধারণা তিনি বাতিল করে দেন। নীনা ভাবেন ডাক্তারের সঙ্গে প্রেমিকের সম্পর্কই বজায় রাখবেন তিনি। প্রেমের ক্ষেত্রে এক বিজয়নীর গর্বে তাঁর উচ্চারণ : “আমার তিন পুরুষ। আমি অনুভব করি, তাদের কামনা আমাকে ঘিরে। . ১. আমি পরিপূর্ণ • ওরা আমার স্বপ্নে বিভোর। ওদের জীবনই আমার জীবন। তিনজনকে নিয়ে আমি পরিপূর্ণ স্বামী! প্রেমিক! বাবা! আর চতুর্থ মানুষটি ক্ষুদে গর্ডন (মৃত প্রেমিকের নামে রাখা পুত্রের নাম) সেও আমার . .” (৪র্থ অঙ্ক)।

কিন্তু নীনার আত্মতৃপ্তির ধারণা অচিরেই ভুল প্রমাণিত হয়। ড. ড্যারেলকে দুবছরের জন্য দূরে পাঠাতে হয় নীনাকে। ছেলে গর্ডন ক্রমে কৈশোর পেরিয়ে যৌবনের দ্বারপ্রান্তে। ছেলেকে তিনি একান্ত আপন করে ভাবেন, কিন্তু গর্ডনের প্রতি ম্যাডেলেইনের প্রেমে নীনা ঈর্ষান্বিত হয়ে ওঠেন, যেমন ঈর্ষান্বিত ছিলেন লরেন্সের Sons and Lovers উপন্যাসে মিসেস মরেল। কিন্তু নীনা মিসেস মরেলকে ছাড়িয়ে যান তাঁর প্রতিশোধপরায়ণতায়।

মিসেস মরেল মিরিয়ামের সঙ্গে পলের প্রেমের সম্পর্কে বাধা দিয়েছেন, তবে পল বিয়ের ব্যাপারে তেমন দৃঢ় ছিল না, নিজেই মিরিয়ামের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙ্গে দিয়েছে। অনুমান করা যায়, পল মিরিয়ামকে বিয়ে করলে মিসেস মরেল ক্ষুদ্ধ হতেন নিঃসন্দেহে, কিন্তু নীনার মত বিয়ে ভাঙ্গার জন্য প্রতিহিংসাপরায়ণ হতেন না কখনোই। গর্ডনের সঙ্গে ম্যাডেলেইনের বিয়ে বন্ধ করতে নীনা সত্যিকার পিতৃপরিচয় জানাতে চান গর্ডনকে। কিন্তু ড. ড্যারেল তাঁর পরিকল্পনায় বাধ সাধেন।

সবাইকে নিজের কর্তৃত্বে রাখার যে প্রবণতা নীনার মধ্যে রয়েছে, তিনি তার সমালোচনা করেন “মানুষকে নিজ অধিকারে রাখার অভ্যাস তোমাকে ছাড়তে হবে; ছাড়তে হবে ওদের জীবনে হস্তক্ষেপ করা। এমন ভাব দেখাও যেন তুমি বিধাতা এবং সবার সৃষ্টিকর্তা” (৮ম অঙ্ক)। শেষ পর্যন্ত নীনাকে হার মানতে হয় তাঁর সর্বগ্রাসী প্রেমের আকাঙ্ক্ষার কাছে। এদিকে, স্যামের মৃত্যুর পর ড. ড্যারেল নীনাকে অন্য কাউকে বিয়ে করতে বলেন। ততদিনে তিনি নীনার মোহমুক্ত হয়েছেন। নীনা এখন মারডেনের কথা ভাবেন এবং তাঁকে বিয়ের মাধ্যমেই নীনা তাঁর বাবার বিকল্পকেই বেছে নেন। প্রেমের সকল উৎস যখন রুদ্ধ, তখন মারস্‌ডেনই তাঁর বিকল্প প্রেম।

 

ও’ নীলের বিপর্যস্ত নায়িকা নীনা - সৈয়দ আনোয়ারুল হক
ও’ নীলের বিপর্যস্ত নায়িকা নীনা – সৈয়দ আনোয়ারুল হক

 

সহায়ক-গ্রন্থ:

ডরিস ভি. ফক: Eugene O’Neill and the Tragic Tension, নিউ ইয়র্ক : Guardian Press, ১৯৮২।

ভার্জিনিয়া ফ্লয়েড : The Plays of Eugene O’Neill ( A New Assessment), নিউ ইয়র্ক: Frederick Ungar Publishing Co., ১৯৮৫।

ইউজীন ও নীল : Strange Interlude, Rpt in Compele Plays,

নিউ ইয়র্ক : The Library of America, ১৯৮৮।

আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন